কলকাতা, 26 ফেব্রুয়ারি: নিয়োগ দুর্নীতি মালায় তৃতীয় অতিরিক্ত চার্জশিট পেশ করে বিস্ফোরক দাবি করল সিবিআই ৷ চার্জশিটের একটি জায়গায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, সুজয়কৃষ্ণ ভদ্রের থেকে 'জনৈক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়' 15 কোটি টাকা দাবি করেছিলেন ৷ অন্য একটি প্রসঙ্গে সিবিআই-এর দাবি তৃণমূলের প্রাক্তন নেতা কুন্তল ঘোষ, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ কয়েকজন চাকরি বিক্রির নাম করে মোট একশো কোটি টাকা তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন ৷ অভিষেকের পাশাপাশি সেই টাকার ভাগ পাওয়ার কথা ছিল পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও মানিক ভট্টাচার্যের।
চার্জশিটের খবর প্রকাশ্যে আসতেই প্রতিবাদের সরব হলেন তৃণমূল সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের আইনজীবী সঞ্জয় বসু ৷ এদিনই তিনি একটি প্রেস বিবৃতি প্রকাশ করে পাল্টা দাবি করেন, তাঁর মক্কেল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে দুই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই ও ইডি এবং কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ৷
বুধবার কলকাতার বিশেষ সিবিআই আদালতে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তৃতীয় সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট পেশ করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ৷ সেখানে দাবি করা হয়েছে, 2017 সালে সুজয়কৃষ্ণ ভদ্র বিভিন্ন এজেন্টদের কাছে থেকে 15 কোটি টাকা চেয়েছিলেন ৷ তিনি জানিয়েছিলেন, এই বিপুল টাকা তাঁর কাছ থেকে চেয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷
চার্জিশিটে আরও দাবি করা হয়েছে, 2017 সালে কুন্তল ঘোষ, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ রায় বর্মন এবং সুরজিৎ চন্দ, সুজয়কৃষ্ণ ভদ্রের কালীঘাটের বাড়িতে গিয়েছিলেন নিয়োগ দুর্নীতির ঘুষের টাকা দিতে ৷ কুন্তল ঘোষের কর্মচারী অরবিন্দ রায় বর্মন বৈঠকের সমস্ত কিছু রেকর্ড করেছিলেন তাঁর মোবাইল ফোনে ৷ পরে সেই অডিয়ো ট্রান্সফার করা হয় ল্যাপটপে ৷ পরবর্তীকালে তদন্তের সময় সেই অডিয়ো হাতে পায় সিবিআই ৷ কেন্দ্রীয় গোয়ান্দের আরও দাবি, বেআইনি সমস্ত নিয়োগ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হত ৷ পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে মাধ্যমে হিসেবে কাজ করতেন সুজয়কৃষ্ণ ৷
পেশ করা চার্জশিটে সিবিআইয়ের আরও দাবি, 'কালীঘাটের কাকু' নামে পরিচিত সুজয়কৃষ্ণ ভদ্র জানিয়েছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় 15 কোটি টাকা বেআইনিভাবে নিযুক্তদের জন্য দাবি করেছেন ৷ তিনি আরও জানান, প্রার্থীরা 6 লক্ষ 50 হাজার টাকা করে দিয়ে দিয়েছিলেন ৷ একটা সময়ে আর টাকা তোলা সম্ভব হচ্ছিল না ৷ তখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি তাঁকে হুঁশিয়ারি দেন। বলেন, টাকা না দিলে তিনি হয় ওই প্রার্থীদের গ্রেফতার করিয়ে দেবেন না হলে তাঁদের যাতে বহুদূরে পোস্টিং হয় সেই ব্যবস্থা করবেন ৷
চার্জশিটে অন্য একটি অংশে সিবিআইয়ের দাবি, সুজয় কৃষ্ণ ভদ্র, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কুন্তল ঘোষরা আরও প্রায় 2 হাজার প্রার্থীর থেকে টাকা তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন ৷ অন্তত একশো কোটি টাকা তুলে তা থেকে পার্থ চট্টোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানিক ভট্টাচার্যকে 20 কোটি টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের ৷
অভিষেকের আইনজীবীর বিবৃতি
এরপরই বিবৃতি দিয়ে ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেকের আইনজীবী জানান, দুই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই ও ইডি'র সঙ্গে তদন্তে সবরকম সহযোগিতা করেছেন অভিষেক ৷ তাও শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলার সাম্প্রতিক চার্জশিটে তাঁর নামে বিভ্রান্তিমূলক ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়েছে সিবিআই ৷ এছাড়া কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও এই ধরনের খবর প্রকাশ করেছে ৷ এখনও পর্যন্ত অভিষেকের বিরুদ্ধে কোনও তথ্য প্রমাণ আদালতে পেশ করতে পারেনি কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ৷ আর সেই জায়গা থেকে এ ধরনের পদক্ষেপকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর আইনজীবী ৷
সঞ্জয় বসু এদিন বিবৃতিতে আরও জানিয়েছেন, তাঁর মক্কেল (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) প্রথম থেকে ইডি এবং সিবিআই-কে তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করে আসছেন ৷ দুই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা যখনই তাঁকে তলব করেছে, তখনই তিনি উপস্থিত হয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রও সরবরাহ করেছেন ৷ কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এরপরেও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করছে ৷
আইনজীবীর কথায়, "মামলার তদন্তকারী সংস্থা ইডি এখনও আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে কোনও চার্জশিট দাখিল করেনি ৷ তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অপরাধে উপস্থিত থাকার কোনও প্রমাণ মেলেনি ৷ তারপরও তৃতীয় অতিরিক্ত চার্জশিট, আমার মক্কেলকে হয়রানির প্রয়াস ছাড়া আর কিছু নয় ৷"
এদিন এই বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ইডিকে কাজে লাগিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পরে একটি রাজনৈতিক শক্তি সিবিআই-এর দিকে ঝুঁকেছে ৷ নির্দিষ্ট অংশের স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্য নিয়েই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির অপব্যবহার করা হচ্ছে ৷ সংশ্লিষ্ট চার্জশিটে প্রমাণের স্পষ্ট অভাব থাকা সত্ত্বেও সন্দেহ তৈরি করার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা করা হয়েছে ৷ ষড়যন্ত্র করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে ব্যবহারের চেষ্টা হচ্ছে বলে মনে করেন অভিষেকের আইনজীবী ৷