কলকাতা, 8 মে : দিল্লির 'বয়েজ় লকার রুম' বিতর্কের মাঝেই মহিলাদের ব্যক্তিগত ছবি গুগল ড্রাইভে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করার অভিযোগ উঠল কলকাতায় । এই অভিযোগ তুলে একের পর এক টুইট করলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এক ছাত্রী । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক প্রাক্তন ছাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন তিনি । তাঁর অভিযোগ, মহিলাদের ব্যক্তিগত ছবি গুগল ড্রাইভে আপলোড করে তা বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতেন অভিযুক্ত । তাঁর টুইট করার পরই ওই প্রাক্তন ছাত্রের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তুলে সরব হন আরও অনেকেই । অভিযুক্ত ছাত্রের তৈরি গুগল ড্রাইভ আরও অনেকেই ব্যবহার করতেন বা তার সম্পর্কে জানতেন বলে অভিযোগ উঠেছে ।
দিল্লির 'বয়েজ় লকার রুম' ঘটনার পরপরই Aiyoobrows নামে একটি টুইটার প্রোফাইলে একাধিক টুইট করা হয় । প্রথমটিতে দাবি করা হয়, "বয়েজ় লকার রুমের ফর্মে দক্ষিণ দিল্লির ছেলেরা যা করছে, কলকাতার ছেলেরা সেটাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং মহিলাদের ছবি ব্যবহার করে একটি গুগল ড্রাইভ তৈরি করেছে ।" দ্বিতীয় টুইটে লেখা হয়, "কলকাতার একটি প্রিমিয়ার প্রতিষ্ঠানের একদল ছেলে মহিলাদের অর্ধনগ্ন ও নগ্ন ছবি গুগল ড্রাইভে ব্যবহার করছে এবং তা বন্ধুদের মধ্যে সার্কুলেট করছে ।" অতীতে এই ছবিগুলো দিয়ে মেয়েদের হুমকিও দেওয়া হত বলে অভিযোগ করা হয় টুইটে । সেখানে আরও একটি টুইটে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তন ছাত্রের নাম করে তাঁর বিরুদ্ধে ড্রাইভটি তৈরির অভিযোগ তোলা হয় । তাঁর এক বন্ধু যিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েরই অর্থনীতি বিভাগের পড়ুয়া ছিলেন তাঁর কাছেও এই গুগল ড্রাইভটির অ্যাক্সেস ছিল বলে অভিযোগ । কলকাতার MUN অর্থাৎ মডেল ইউনাইটেড নেশনস ও ডিবেট সার্কেলে অভিযুক্ত ছেলেরা পরিচিত এবং বহু বছর ধরে তারা এভাবে মেয়েদের ছবি সার্কুলেট করছে বলে অভিযোগ করা হয় । অভিযুক্ত এবং তাঁর বন্ধু ছাড়াও আরও অনেকে এই ড্রাইভ ব্যবহার করতেন বা এর সম্পর্কে জানতেন বলে দাবি করা হয় টুইটে ।
জানা গেছে, মেয়েদের ছবি গুগল ড্রাইভ তৈরি করে শেয়ার করার অভিযোগে অভিযুক্ত ছাত্র সৌরভ (নাম পরিবর্তিত) 2014 সালে যাদবপুরের ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভরতি হন এবং 2018 সালে তাঁর স্নাতক কোর্স সম্পূর্ণ হয় । সংবাদমাধ্যমে দেওয়া অভিযোগকারিণীর বক্তব্য অনুযায়ী, সৌরভ ও অভিযোগকারিণী বন্ধু ছিলেন এবং তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেট ক্লাবের সদস্য ছিলেন । 2015 সালে সৌরভের সঙ্গে চ্যাট করার সময় তাঁকে নিজের গোপন ছবি পাঠান অভিযোগকারিণী । নিজের ইচ্ছাতেই ছবি পাঠালেও তিনি আশা করেছিলেন ওই ছবি হয় ডিলিট করে দেওয়া হবে, না হয় গোপন রাখা হবে । ওইদিন কথোপকথনের পর সৌরভের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেন অভিযোগকারিণী । কারণ, তিনি তারপর আর সৌরভের সঙ্গে কথা বলায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না । এমন কী, ডিবেট সোসাইটির বৈঠকেও যাওয়া বন্ধ করে দেন তিনি এবং ধীরে ধীরে সৌরভের সঙ্গে পুরোপুরি কথা বলা বন্ধ করে দেন । তারপর 2018 সালে একজন অভিযোগকারিণী তাঁর ব্যক্তিগত ছবি গুগল ড্রাইভে থাকার বিষয়ে জানতে পারেন এক সহপাঠিনীর কাছ থেকে । সেই সহপাঠিনী তাঁকে জানান, অনেকেই তাঁর সেই ছবি দেখেছেন । ডিবেট সোসাইটি ও MUN ড্রাইভের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে এবং এটা একটা ওপেন সিক্রেট । তখনই অভিযোগকারিণী জানতে পারেন তাঁর ব্যক্তিগত ছবি তাঁর অনুমতি ছাড়াই সার্কুলেট করা হচ্ছে । সৌরভ এবং তাঁর বন্ধু অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র তন্ময়ের (নাম পরিবর্তিত) নামে করা অভিযোগে টুইট সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই আরও অনেকে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন ।
তাঁরা অভিযোগ করেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেট সোসাইটিতে ও কলকাতার MUN সার্কেলে এই গুগল ড্রাইভের বিষয়টি 'ওপেন সিক্রেট' ছিল । অনেকেই এই ড্রাইভে থাকা ছবি না দেখলেও ড্রাইভের বিষয়ে শুনেছিলেন । আবার তন্ময় অনেক সহপাঠীকে ও বন্ধুদের ড্রাইভে থাকা মেয়েদের ব্যক্তিগত ছবি দেখাতেন বলে অভিযোগ । হোয়াটসঅ্যাপে সৌরভের করা অশ্লীল মেসেজের স্ক্রিনশটও ছড়িয়ে পড়েছে সোশাল মিডিয়ায় । তবে, অনেকেই সামনে আসার ভয়ে অথবা প্রমাণ না থাকায় আগে এগিয়ে আসেননি বলে দাবি করেছেন । এই ধরনের গুগল ড্রাইভ রয়েছে বলে তাঁর কাছে সৌরভ স্বীকার করেছিলেন বলে ফেসবুকে দাবি করেন এক মহিলা । তিনি তাঁর ফেসবুকে করা পোস্টে লেখেন, "আমি আগে এ বিষয়ে বলিনি তার কারণ, অভিযুক্ত আমার ছোটবেলার বন্ধু, আমার প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ড ও বেস্টফ্রেন্ড ছিল । আমি যখন আমার প্রাক্তনের তৈরি গুগল ড্রাইভের বিষয়ে পোস্টগুলি পড়ছিলাম এবং আমি জানি আমি আর কমফর্টেবল সাইলেন্সের পিছনে লুকিয়ে থাকতে পারব না । আমি যখন গত বছর ড্রাইভটির বিষয়ে যখন জানতে পারি তখন আমার প্রাক্তনকে কনফ্রন্ট করেছিলাম । ও তখন আমায় বলেছিল ওটা ডিলিট করে দিয়েছে । যদি আমার ছবিও ওর মধ্যে থাকে সেই ভয়ে তখন আমি বিষয়টি জানানোর সাহস পাইনি । ড্রাইভটির অস্তিত্ব আছে । আমি কখনও সেটা দেখিনি । তবে, আমি সেটার ব্যাপারে শুনতে পেয়েছিলাম । তার উপর ওর স্বীকারোক্তি চেরি অন দা টপ হয়ে যায় ।"
Aiyoobrows তাঁর টুইটে লেখেন, আনুমানিক 2016 সাল থেকে ওই গুগল ড্রাইভটি চলছে । এমন কী, তন্ময় ওই ড্রাইভে থাকা মেয়েদের ব্যক্তিগত ছবি তাঁর বন্ধুদের দেখাতেন বলে একজনের বয়ানের ছবি দিয়েও ট্যুইট করেন Aiyoobrows । গোপনীয়তা রক্ষার জন্য তাঁর নাম প্রকাশ করা হয়নি । বয়ানে বলা হয়েছে, "কয়েক বছর আগে এক কমন ফ্রেন্ডের বাড়িতে তন্ময় আমাদের বলে, একটা MUN কমিটি, ও যার সঙ্গে যুক্ত ছিল সেই সম্পর্কিত কিছু ইন্টারেস্টিং জিনিস আমাদের দেখাতে চায় । কী দেখাতে চায় সেই সম্পর্কে আর কোনও ওয়ার্নিং ছাড়াই নিজের ফোন স্ক্রিন আমাদের দেখায়, যেখানে একটা নগ্ন ছবি ছিল, কিন্তু কারও মুখ স্পষ্ট ছিল না । ও বলে, এটা ওর চেনা একজন এবং তাঁর পরিচয় সম্পর্কে আমাদের বলতে শুরু করে । MUN-এর যার সম্পর্কে বলছিল আমি তাঁকে চিনি এবং আমরা ফেসবুকে বন্ধু । আরও অনেকের এই রকম ছবি আছে বলে জানায় ও । আমি ওকে বলি, আমি এই ধরনের ছবি দেখতে চাই না । আমি ওর থেকে জানতে চাই, কোথা থেকে এই ধরনের ছবি পেয়েছে । ও তখন বলে এগুলো ওর বন্ধুর । ওই বন্ধু 'পাগল ছেলে' এবং এই ছবিগুলো ওর কনকোয়েস্ট থেকে পাওয়া বলেও জানায় ও । ও আরও জানায়, এই ছবিগুলো একটি গুগল ড্রাইভে রয়েছে, যেটা JU MUN কমিটির ই-মেইল আইডির সঙ্গে যুক্ত ।"
এভাবেই একাধিক অভিযোগ উঠেছে সৌরভ ও তন্ময়ের নামে । ইতিমধ্যেই অভিযোগগুলির সম্পর্কে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানো হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস এবং সায়েন্স ফ্যাকাল্টি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের তরফে । AFSU এবং SFSU-এর অভিযোগের ভিত্তিতে গতকালই কলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইমে অভিযোগ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য এ বিষয়ে বলেন, "আমাদের কাছে AFSU এবং SFSU থেকে অভিযোগ এসেছে । গুগল ড্রাইভে মেয়েদের আপত্তিকর ছবি শেয়ার করা হয়েছে । ঘটনাটা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যে হয়নি । অভিযোগকারী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের । অভিযুক্ত কেউ কেউ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের, আবার কেউ কেউ প্রাক্তন পড়ুয়াও আছেন । ঘটনাটা আমরা সাইবার ক্রাইমে রিপোর্ট করেছি । পুলিশ এবার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে । যাদবপুরের ভিতরে ঘটনাটি না ঘটায় যাদবপুর নিজে থেকে কোনও ব্যবস্থা নেবে না ।"