মধ্যমগ্রাম, 26 ফেব্রুয়ারি: কুমারটুলিতে ট্রলি ব্যাগে দেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে ৷ কীভাবে খুন করা হয়েছিল সুমিতা ঘোষকে ? সেই উত্তর খুঁজতে মঙ্গলবার রাতে কড়া নিরাপত্তায় অন্যতম অভিযুক্ত ফাল্গুনী ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে মধ্যমগ্রামের বীরেশ পল্লীর ভাড়া বাড়িতে পৌঁছয় কলকাতার উত্তর বন্দর থানার পুলিশ । সঙ্গে ছিল ফরেন্সিক দল ৷ ধৃতকে সঙ্গে নিয়ে 5 ঘণ্টা ধরে চলে ঘটনার পুনর্নির্মাণ ৷
পুলিশ সূত্রে খবর, মঙ্গলবার ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে খুনে ব্যবহৃত ইটের টুকরো ও রক্তের নমুনা ৷ পুনর্নির্মাণের সময় ফাল্গুনীর সঙ্গে কথা বলে তদন্তকারীরা জানতে পারেন খুনে ব্যবহৃত বঁটিটি কোথায় ফেলা হয়েছে । বুধবার বঁটির খোঁজে তল্লাশি করা হবে বলে জানা গিয়েছে ৷ তদন্তের স্বার্থে এই নিয়ে বেশি কিছু বলতে নারাজ পুলিশের পদস্থ কর্তারা ।
কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান রূপেশ কুমার বলেন, "মৃতা সুস্মিতা ঘোষের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট আমাদের হাতে এসেছে ৷ দেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল ৷ দেহটি খণ্ডিত অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ রাখার ফলে পচন ধরে যায় ৷" কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড বিভাগের গোয়েন্দা সূত্রে খবর, সম্পত্তির লোভেই সুমিতা ঘোষকে খুন করে মা ও মেয়ে । প্রথমে মৃতা প্রৌঢ়ার মাথায় ইট দিয়ে একাধিকবার আঘাত করা হয় । মাথার খুলিতে রক্ত জমাট এবং হাড় ক্ষয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে । এরপর মৃতার পা বঁটি দিয়ে কেটে বাড়ির পাশের জলাশয়ে ফেলে দেয় মা ও মেয়ে ৷
খুনে ব্যবহৃত সেই ধারালো অস্ত্রটি উদ্ধার হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। ধৃত ফাল্গুনীর কাছ থেকে প্রথমেই ভাড়া বাড়ির চাবি নিয়ে তদন্তকারীরা প্রবেশ করেন ঘরের ভিতরে । তাঁদের সঙ্গে প্রবেশ করেন ফরেন্সিক দলের সদস্যরাও । সংগ্রহ করা হয় রক্তের নমুনা । এরপর খুনের জায়গাটি ভালোভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন তদন্তকারীরা।

এরপর ধৃত ফাল্গুনীকে বাইরে এনে খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানতে চান তদন্তকারীরা ৷ আকার ইঙ্গিতে তদন্তকারীদের বাড়ি লাগোয়া একটি ফাঁকা জমি দেখিয়ে দেয় ধৃত মহিলা । টর্চের আলো নিয়ে তল্লাশি চালিয়ে ওই ফাঁকা জমি থেকে উদ্ধার হয় রক্তমাখা ইটের টুকরো।
পুনর্নির্মাণের সময়ে আরও বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ । খুনের আগের দিন নীল রঙের ট্রলি ব্যাগটি বাজার থেকে কিনে এনেছিলেন আরতি ও তাঁর মেয়ে ফাল্গুনী । সেই ট্রলি ব্যাগ নিয়ে তাঁদের দু'জনকে ভাড়া বাড়িতে ঢুকতেও দেখেছেন স্থানীয়দের অনেকে । তার পরের দিনই মেলে প্রৌঢ়া সুমিতা ঘোষের দেহাংশ ভরা নীল রঙের ট্রলি ব্যাগটি । অর্থাৎ, আগে থেকেই তৈরি ছিল খুনের 'চিত্রনাট্য'!

পুলিশ সূত্রে খবর, মধ্যমগ্রামের ভাড়া বাড়িতে গত 11 ফেব্রুয়ারি যান প্রৌঢ়া সুমিতা ঘোষ । তাঁর বাড়ি অসমের যোরহাটে । শ্বশুরবাড়ি বর্ধমানের নন্দঘাটে । দীর্ঘদিন স্বামীর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক ছিল না প্রৌঢ়ার । ফাল্গুনীও স্বামীর থেকে আলাদা থাকতেন ৷ অভিযোগ, ফাল্গুনীর উৎশৃঙ্খল আচরণ পছন্দ করতেন না স্বামী । সেই কারণে এই দূরত্ব । তাঁর বেপরোয়া জীবনযাত্রা এবং উৎশৃঙ্খল আচরণ নিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন ফাল্গুনীর ভাড়া বাড়ির প্রতিবেশীরাও ।
অবশ্য, স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না-হওয়া সত্ত্বেও কেন ফাল্গুনীর মধ্যমগ্রামের ভাড়া বাড়িতে গিয়েছিলেন তাঁর পিসি শাশুড়ি সুমিতা ঘোষ ? সেই উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি ৷ তদন্তকারীরা আরও জানতে পেরেছেন, সুমিতা ঘোষের বেশ কিছু সম্পত্তি রয়েছে অসমে । সেই সম্পত্তির নিয়ে বিবাদের জেরে এই খুন কি না, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ ।
এদিকে, পুনর্নির্মাণের গোটা পর্বে কার্যত নিরুত্তাপ ছিলেন প্রৌঢ়া খুনের অন্যতম অভিযুক্ত ফাল্গুনী ঘোষ । সংবাদমাধ্যমের সামনেও তিনি একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি । তবে, তদন্তে ফাল্গুনী সহযোগিতা করছেন বলে জানা গিয়েছে ৷