কলকাতা, 1 জুন : কে কে'র শেষ গানের অনুষ্ঠানের সাক্ষী রইল শহর কলকাতা । আর তাঁকে ঘিরে দুটি উল্লেখযোগ্য পোস্ট দেখা গেল বাংলার দুই সংস্কৃতিপ্রবণ এবং বিনোদন দুনিয়ার প্রতিষ্ঠিত মানুষের কলমে । তবে, দু'টি একেবারের ভিন্ন ধরনের । একজন উগরে দিয়েছেন ক্ষোভ । সেই একজন হলেন রূপঙ্কর বাগচি । তিনি লাইভে এসে বলেছেন, "কে এই কে কে ? যাকে নিয়ে কলকাতা এত মাতামাতি করে ? কই বাংলার শিল্পীদের নিয়ে এত মাতামাতি হয় না তো ?" তাঁর এই পোস্টের কিছুক্ষণের মধ্যেই ভক্তের কানে আসে "নেই কে কে।"
রূপঙ্কর বাগচির সেই পোস্ট দেখার পর প্রতিবাদে সরব হয়েছে শিল্পীমহল । কেউ তাঁর এই ঔদ্ধত্য ভাল চোখে নেননি । একজন শিল্পী আরেকজন শিল্পীকে কীভাবে সর্বসমক্ষে এতটা খাটো করতে পারে তা ভাবনার অতীত সকলের কাছে । আরেক দিকে কৃষ্ণকুমার কুন্নাথকে তাঁর ভাল না লাগার, কারণ জানালেন কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Srijato Bandyopadhyay After The Death of KK )।
তাঁর এই গায়ককে ভাল না লাগার কারণ বেশ করুণ । আদরের ছোট ভাইয়ের হাত ধরে কে কে'-প্রতি ভালোবাসা শ্রীজাতর । ভাই ভাল গিটার বাজাতেন, গান গাইতেন । তাঁকে দাদা শ্রীজাত গান গাইতে বললেই তিনি গেয়ে উঠতেন "ইয়ারোঁ, দোস্তি বড়ি হি হসীন হ্যায়" আর "হম রহেঁ ইয়া না রহেঁ কল, কল ইয়াদ আয়েঙ্গে ইয়ে পল"। সেই ভাই এক পথ দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর থেকে কে কে'র গান আর শুনতে পারেন না শ্রীজাত । ভাইকে অসময়ে হারানোর ক্ষত আরও দগদগে হয়ে ওঠে কে কে'র গান শুনলে । এহেন শ্রীজাতও গতকাল এই গায়ককে হারিয়ে বেদনায় কাতর । খবরটা দেখার পরই তিনি সোশ্যালে ব্যক্ত করেন নিজের খারাপ লাগা ।
তিনি লেখেন, "KK-র গান আমার অসহ্য লাগে । গত 16 বছর ধরে অসহ্য লাগে । সেই 2006-এর ডিসেম্বর থেকে আজ অবধি KK-র গান আমি সহ্য করতে পারি না। ক্যাব-এর রেডিও-তে হঠাৎ বেজে উঠলে চালককে তৎক্ষণাৎ বলি চ্যানেল সরিয়ে দিতে, কোনও জমায়েতে হুট করে বেজে উঠলে সন্তর্পণে উঠে বাইরে চলে যাই। এতটাই অসহনীয় আমার কাছে, KK-র গান, গত 16 বছর ধরে । টানা 16 বছর, আমি KK-র গান শুনিনি । সত্যি বলতে কী, পালিয়েছি তাঁর কাছ থেকে ।"কেন পালান শ্রীজাত কে কে'র কাছ থেকে ?
- " class="align-text-top noRightClick twitterSection" data="">
শ্রীজাত লিখেছেন, "আসলে তাঁর কাছ থেকে নয়, পালিয়েছি আমার অকালপ্রয়াত ভাইয়ের কাছ থেকে । ব্যক্তিগত ক্ষয়ের কথা, আন্তরিক ক্ষরণের কথা সমক্ষে তুলে ধরিনি কখনওই, জীবনের প্রতি সংকোচ আর স্মৃতির প্রতি সম্ভ্রম থেকেই । কিন্তু কিছু আকস্মিকতায় সেসব বাঁধ, সেসব আড়ালও হয়তো টুটে যায় সাময়িক ভাবে । ছোট ভাই, যার আদরের নাম পুশকিন, তার প্রিয় গায়ক ছিলেন KK । আর তার হাত ধরে আমারও । গিটারে তার হাত চলাফেরা করত চমৎকার, আর সুরে গলাও খেলত দিব্যি । তার পড়াশোনা আর পরীক্ষার চাপের ফাঁকে ফাঁকে আমি তাকে জোর করে বসাতাম, ‘গান শোনা দেখি দু’খানা’ । এমন বললে সে দু;খানা গানই গেয়ে উঠত কেবল । ‘ইয়ারোঁ, দোস্তি বড়ি হি হসীন হ্যায়’, আর ‘হম রহেঁ ইয়া না রহেঁ কল, কল ইয়াদ আয়েঙ্গে ইয়ে পল’ । সেসব গান তখন দেশজোড়া প্রজন্মের বাঁচায় আগুন জোগাচ্ছে । আমাদের দু’কামরার ছোট্ট বিছানায়, আলসে মশারির ছোঁয়া লাগা সকালবেলায়, গিটারে সাবলীল আঙুল বুলিয়ে বছর একুশের পুশকিন চোখ বন্ধ করে গেয়ে উঠত এই দুই গান । আমাকে এটুকুও বুঝতে না-দিয়ে যে, আর দু’বছরের মধ্যে ভয়াবহ বাইক দুর্ঘটনায় সে চলে যাবে ন’দিনের দীর্ঘ ঘুমে । সাড়া দেবে না আমাদের কারও ডাকে, গিটারের তার থেকে আঙুলের মায়া ছাড়িয়ে নিয়ে দশ দিনের মাথায় হাজির হবে গনগনে আগুনের সামনে, শরীরের নির্জীব সাক্ষী দিতে ।"
আরও পড়ুন : জীবন কত ক্ষণস্থায়ী ; মোদি থেকে সেহওয়াগ, কে কে'র মৃত্যু কাঁদিয়ে দিল সকলকে
কবি আরও লেখেন, "সেই থেকে KK আমার শত্রু, সেই থেকে এই গানগুলো আমার দু’চোখের বিষ । সেই থেকে আমি KK-র অসামান্য সুরেলা আর টানটান দরাজ কণ্ঠ থেকে পালিয়ে বেড়াই, কোনো অনুষ্ঠানে তিনি মাইক হাতে নিলেই আমি উঠে চলে আসি, কখনও পিকনিকের দুপুরে তাঁর গান বাজানো হলে আমার বাড়ি যাবার তাড়া চলে আসে । কেউ জানে না, কিন্তু 16 বছর ধরে এই একজন মানুষের গানের কাছ থেকে পালাই আমি । পিঠ বাঁচিয়ে, মন বাঁচিয়ে, চোখ বাঁচিয়ে । আজ তিনি চলে গেলেন, যাবার মুহূর্তের কিছু আগেও গানই তাঁর সঙ্গ দিল । কী গেয়েছিলেন, জানি না । KK আসছেন শুনেই নজরুল মঞ্চের কাছাকাছি দিয়ে যাতায়াতের পথ বাছিনি আজ । কে বলতে পারে, যদি ‘ইয়ারোঁ, দোস্তি...’-র এক কলিও কানে ঢুকে আসে ? পালিয়েছি আজও । কেবল বুঝিনি, তাঁরও পালানোর মতলব আছে, পুশকিনের মতোই । রাগ ছিল লোকটার উপর খুব । কখনও দেখা হলে কেঁদেকেটে ঝগড়া করার ছিল অনেকখানি । জড়িয়ে ধরবারও লোভ ছিল খুব, অভিমানে, অসহায়তায় । সেসব গানের সঙ্গেই ভেসে গেল । ‘হম রহেঁ ইয়া না রহেঁ কল, কল ইয়াদ আয়েঙ্গে ইয়ে পল’... গানের কথাকে একজীবনে এমন অসহ সত্যি করে দিয়ে চলে যাবার মতো মানুষ কমই আসেন পৃথিবীতে । KK তাঁদেরই একজন । 16 বছরের গভীর ক্ষতের উপর মলমের বদলে মশাল চেপে ধরলেন তিনি । এমনই মশাল, যার আগুনে দূরে কোথাও পুশকিনের গিটারটাও পুড়ে যাচ্ছে, একা একা ।"
কে কে'র দেহ পাঠানো হয়েছে পোস্টমর্টেমের জন্য । কারণ তাঁর দেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে । সূত্রের খবর তিনি হোটেলে ঢুকে পড়ে গিয়েছিলেন একবার । সেই কারণেই এই ক্ষত । নিয়ম অনুযায়ী তা ময়না তদন্তের দাবি রাখে । তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন টলিউড এবং বলিউডের সমস্ত তারকারাই ।