কলকাতা, 1 জুন : বিরল অসুখ কাওয়াসাকি ডিজ়িজ়ে আক্রান্ত চার মাস বয়সি এক শিশু COVID-19 সংক্রমণের শিকার হয়েছিল। তার শারীরিক অবস্থা সংকটজনক অবস্থায় পৌঁছে যায়। অবশেষে, বিরল এই অসুখ এবং COVID-19-এর সংক্রমণ থেকে মুক্ত হয়ে হুগলির বাসিন্দা এই শিশুপুত্র এখন সুস্থ রয়েছে। এই শিশুর চিকিৎসা হয়েছে কলকাতার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে। চার মাস বয়সি কোনও শিশুর ক্ষেত্রে একই সঙ্গে কাওয়াসাকি ডিজ়িজ় ও COVID-19 সংক্রমণ এবং তার পরে সুস্থ হয়ে ওঠার ঘটনা গোটা বিশ্বে এই প্রথম।
হুগলির বাসিন্দা এই শিশুর জন্ম হয়েছিল কলকাতার মুকুন্দপুরে অবস্থিত বেসরকারি একটি হাসপাতালে। জন্মের পর সুস্থ এই শিশুটি বাড়িও ফিরে যায়। এর পর জ্বর হয় তার। প্রচণ্ড কান্নাকাটি করছিল শিশুটি। স্থানীয় একটি নার্সিংহোমে তার চিকিৎসা শুরু হয়। তবে শিশুটির জ্বর কমছিল না। কান্নাকাটিও থামছিল না। এর পর 2 মে এই শিশুকে নিয়ে আসা হয় মুকুন্দপুরের বেসরকারি ওই হাসপাতালে।
কলকাতার বেসরকারি এই হাসপাতালের পেডিয়াট্রিশিয়ান অ্যান্ড নিওনেটাল স্পেশালিস্ট চিকিৎসক সৌম্যব্রত আচার্য জানিয়েছেন, চার মাস বয়সি এই শিশুকে যখন এখানে নিয়ে আসা হয়, তখন তার হাই ফিভার ছিল, খুব কান্নাকাটি করছিল। কোনওভাবে শান্ত করা যাচ্ছিল না। শিশুটি ভরতি হওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষা করা হয়। শুরু করা হয় অ্যান্টিবায়োটিক। শিশুটির জ্বর কমছিল না। এই হাসপাতালে ভরতির পরের দিন দেখা যায়, শিশুটির গোটা শরীরে লাল রঙের র্যাশ বেরিয়েছে। তার চোখও লাল হয়ে গেছে। একটি চোখ থেকে রক্তক্ষরণ হতে শুরু করেছে। ঠোঁট, জিভও লাল হয়ে গেছে। শিশুটি কান্নাকাটি করছিল, তাকে খাওয়ানো যাচ্ছিল না, শান্ত করা যাচ্ছিল না। শিশুটি হাই ফিভার নিয়ে এসেছে, সেই কারণে তার সোয়াবের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এদিকে ৩-৪ দিন ধরে হাই ফিভার, তার সঙ্গে শরীরে র্যাশ রয়েছে, এই উপসর্গগুলি দেখে রেয়ার ডিস-অর্ডার কাওয়াসাকি ডিজ়িজ়ের সঙ্গে মিল রয়েছে বলে চিকিৎসকদের সন্দেহ হয়।
চিকিৎসক সৌম্যব্রত আচার্য বলেন, "আমাদের সন্দেহ হয়েছিল, এই শিশুটির কাওয়াসাকি ডিজ়িজ়ও হতে পারে। এর পরে ওর ইকো করে দেখা হয়। ইকোর রিপোর্টে দেখা গেল, কাওয়াসাকি ডিজ়িজ়ের ক্ষেত্রে হার্টে যে পরিবর্তনগুলি হয়, সেগুলি সব এই শিশুটির ক্ষেত্রে রয়েছে। এদিকে সোয়াবের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা গেল, এই শিশুটি COVID-19 পজ়িটিভ। তখন দু'টি বিষয়ে আমরা এক সঙ্গে ডিল করছি, একদিকে কাওয়াসাকি ডিজ়িজ়, অন্যদিকে COVID-19। শিশুটির শারীরিক অবস্থাও প্রচণ্ড ক্রিটিকাল ছিল।" এর পরে কলকাতার বেসরকারি এই হাসপাতালের চিকিৎসকরা দেখেন, কাওয়াসাকি ডিজ়িজ়ের চিকিৎসায় এই শিশুটির শারীরিক অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছে। তাকে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (PICU)-এ রাখা হয়েছিল। এই অবস্থায় এই শিশুকে কোনও COVID হাসপাতালে রেফারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ, এই শিশুটি COVID-19-এ আক্রান্ত হয়েছে এবং মুকুন্দপুরের বেসরকারি ওই হাসপাতালে COVID-19 আক্রান্ত শিশুদের জন্য আইসোলেশন বেড নেই। সেই জন্য শিশুটিকে রেফার করা হয় এম আর বাঙুর হাসপাতালে। তবে সেখানেও COVID-19-এ আক্রান্ত শিশুদের জন্য আইসোলেশন বেড ছিল না। যে কারণে এই শিশুকে রেফার করা হয় কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। ৭-৮ দিন পরে কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এই শিশুর আবার সোয়াবের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা হয় তার COVID-19 নেগেটিভ এসেছে। এর পরে দিন ১০-এর মাথায় এই শিশুকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়। গত শুক্রবার মুকুন্দপুরের বেসরকারি ওই হাসপাতালে ফের এই শিশুটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন চিকিৎসক সৌম্যব্রত আচার্য।
তিনি বলেন, "শিশুটি এখন ভালো আছে। ওর ওজন বেড়েছে, আগের মতো স্বাভাবিকভাবে হাসছে-খেলছে। এই শিশুটির আবার ইকো করে দেখা হয়। কাওয়াসাকি ডিজ়িজ়ের কারণে এই শিশুটির হার্টের যে আর্টারিগুলো ফুলে গেছিল, সৌভাগ্যবশত সেগুলি স্বাভাবিক হয়ে গেছে।"